অবলোক

ডেঙ্গুতে জ্বর কমার পরই ঝুঁকি বাড়ে, যেসব বিষয়ে সতর্কতা জরুরি

পড়তে ৬ মিনিট
ডেঙ্গুতে জ্বর কমার পরই ঝুঁকি বাড়ে, যেসব বিষয়ে সতর্কতা জরুরি

ডেঙ্গুতে অনেক সময় জ্বরটাই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। শরীর গরম, মাথাব্যথা, দুর্বলতার মধ্যেই রোগীকে ঘরে রেখে বিশ্রাম

ডেঙ্গুতে অনেক সময় জ্বরটাই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। শরীর গরম, মাথাব্যথা, দুর্বলতার মধ্যেই রোগীকে ঘরে রেখে বিশ্রাম নেওয়া হয়। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় অনেক সময় আসে জ্বর কমতে শুরু করার পর।

এ সময় শরীরে প্লাজমা লিকেজ হয়ে রক্তনালির ভেতরের তরল কমে গেলে রক্তচাপ ও রক��তসঞ্চালনে সমস্যা তৈরি হতে পারে, এমনকি শকও দেখা দিতে পারে। তাই ডেঙ্গু হলে শুধু জ্বর কমানো নয়, রোগীর শরীরে পানিশূন্যতা হচ্ছে কি না, প্রস্রাব কেমন হচ্ছে এবং কোনও বিপৎসংকেত দেখা দিচ্ছে কি না সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।

জ্বরের শুরু থেকেই তরল গ্রহণে নজর দিন
উচ্চ জ্বরের সঙ্গে বমি, খাওয়ার অনীহা বা শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বেরিয়ে যাওয়ার কারণে পানিশূন্যতা হতে পারে। তাই রোগীর সহনশীলতা অনুযায়ী অল্প অল্প করে বারবার তরল দেওয়া যেতে পারে। খাবার স্যালাইন, বিশুদ্ধ পানি, ডাবের পানি, স্যুপ কিংবা উপযুক্ত ঘরোয়া তরল খাবার রাখা যেতে পারে।

তবে জোর করে অতিরিক্ত পানি বা স্যালাইন খাওয়ানোও ঠিক নয়। ডেঙ্গুতে কতটা তরল প্রয়োজন, তা রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হয়। গুরুতর অবস্থায় শিরায় তরল দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত তরলও ফুসফুসে পানি জমার মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে।

জ্বর কমলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না
ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজ সাধারণত জ্বর কমার সময় শুরু হয় এবং প্রায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। সামগ্রিকভাবে অসুস্থতার তৃতীয় থেকে অষ্টম দিনের মধ্যে এই সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই থার্মোমিটারে জ্বর কমে গেলেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায় না। এই সময়ে পেটে ব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্থিরতা, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

রক্তচাপের পাশাপাশি পালস ও প্রস্রাবও গুরুত্বপূর্ণ
ডেঙ্গুতে শক শুরু হওয়ার সময় শুধু সিস্টোলিক রক্তচাপ স্বাভাবিক দেখালেও বিপদ হতে পারে। পালস, রক্তচাপ, পালস প্রেসার, ত্বকের রক্তসঞ্চালন এবং প্রস্রাবের পরিমাণও রোগীর অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পালস প্রেসার অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া শকের একটি সতর্কসংকেত হতে পারে।

বাড়িতে রোগীর প্রস্রাবের পরিমাণের দিকেও নজর রাখুন। উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বা কয়েক ঘণ্টা প্রস্রাব না হলে চিকিৎসকের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা উচিত।

বিপদ সংকেত দেখলে ঘরোয়া চিকিৎসায় নয়
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, রক্তবমি, পায়খানায় রক্ত, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা এবং শ্বাসকষ্ট ডেঙ্গুর গুরুতর হওয়ার সতর্কসংকেত হতে পারে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো পরিবর্তনও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে ফার্মেসির কর্মী, প্রতিবেশী বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া উচিত।

জ্বরের ওষুধেও ভুল করা যাবে না
ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। জ্বর ও ব্যথার জন্য সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেনসহ এনএসএআইডি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড বা অন্য ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।

পরীক্ষা করালেও ফলাফল বুঝে নিতে হবে
জ্বরের প্রথম সাত দিনের মধ্যে এনএস১ অ্যান্টিজেন বা আণবিক পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায়। তবে এনএস১ নেগেটিভ এলেই ডেঙ্গু পুরোপুরি বাদ যায় না। রোগের সময়কাল ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক প্রয়োজনে আইজিএমসহ অন্য পরীক্ষা দিতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরীক্ষার রিপোর্টের অপেক্ষায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা পর্যবেক্ষণ যেন দেরি না হয়।

প্লাটিলেট কমলেই আতঙ্ক নয়
ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে যাওয়া খুবই পরিচিত বিষয়। তবে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা কমেছে বলেই রোগীর অবস্থা গুরুতর নয়, শক, গুরুতর রক্তপাত এবং অঙ্গের জটিলতাও ডেঙ্গুর ভয়ংকর রূপের অংশ।

স্থিতিশীল রোগীর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্লাটিলেট কম থাকার কারণে নিয়মিত প্লাটিলেট দেওয়ার পক্ষে বর্তমান গাইডলাইনে সমর্থন নেই, প্রয়োজন হলে চিকিৎসক পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন। পেঁপে, আমলকি, ডালিম, মিষ্টি কুমড়া বা অন্য পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখুন। ভিটামিন এ, খনিজসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের উৎস ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। কিন্তু পেঁপে বা পেঁপে পাতার রস দ্রুত প্লাটিলেট বাড়ায় না।

মশার কামড় থেকেও রোগীকে সুরক্ষিত রাখুন
ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশার কামড় থেকে বাঁচানোও জরুরি, কারণ অসুস্থতার প্রথম সপ্তাহে রক্তে ভাইরাস থাকতে পারে এবং মশার মাধ্যমে তা অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে। তাই মশারি ব্যবহার, মশা প্রতিরোধক ব্যবস্থা এবং ঘর ও আশপাশের জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন।

ডেঙ্গুতে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, জ্বর কমে যাওয়াকে শেষ সংকেত মনে না করা। অসুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে রোগীর তরল গ্রহণ, প্রস্রাব, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট ও সামগ্রিক অবস্থার দিকে নজর রাখুন। সামান্য সন্দেহজনক পরিবর্তনও অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, হেলথ লাইন